
মহারাজা, মহারানী, বিশাল রাজপ্রাসাদ আর তার চারপাশের গুপ্তধন ও রহস্য—আমাদের চিরকালের কৌতুহল। কিন্তু আপনি কি জানেন, বাংলাদেশের বুকেই লুকিয়ে আছে এমন এক রাজবংশের ইতিহাস, যারা মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত এই বাংলা শাসন করেছিল? যাদের তৈরি করা প্রতিটি ইটের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি রোমাঞ্চকর গল্প?”
হ্যাঁ, আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি রাজশাহী জেলার পুঠিয়া রাজবাড়ী কমপ্লেক্সে। এটি কেবল একটি প্রাসাদ নয়, এটি হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক মন্দির সমৃদ্ধ রাজকীয় এলাকা। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চারশত বছর আগে কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই সাম্রাজ্য? কেন এই রাজবংশের নারীরাই একসময় পুরো শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন? আর এই প্রাসাদের মাটির নিচে কি আসলেই কোনো গোপন সুড়ঙ্গ বা গুপ্তধন আছে? আজকে এর আসল ইতিহাস চলুন, সময়ের পেছনে ফিরে যাওয়া যাক!”
পুঠিয়া রাজবংশের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ষোড়শ শতাব্দীতে, অর্থাৎ ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে। তখন বাংলায় চলছে মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনকাল। সেই সময়ে পুঠিয়া অঞ্চলটি ছিল লস্করপুর পরগনার অন্তর্ভুক্ত। আর এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন লস্কর খাঁ নামের এক পাঠান আফগান জমিদার, যিনি মোঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।”
সম্রাট আকবর এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য তাঁর প্রধান সেনাপতি মানসিংহকে বাংলায় পাঠান। মানসিংহ যখন এই অঞ্চলে আসেন, তখন তাঁর সাথে পরিচয় হয় এক পরম ধার্মিক ও পন্ডিত ব্যক্তিত্বের—যার নাম ছিল বৎসরাজ। তিনি ছিলেন একজন হিন্দু সাধক। বৎসরাজ মানসিংহকে এই যুদ্ধ জয়ে এক বিশেষ কৌশল ও আধ্যাত্মিক সাহায্য প্রদান করেন। যুদ্ধ জয়ের পর, মানসিংহ খুশি হয়ে বৎসরাজকে লস্করপুর পরগনার জমিদারী উপহার দেন।”
তবে বৎসরাজ নিজে সংসারী ছিলেন না বা রাজকীয় লোভ তাঁর ছিল না। তাই তিনি তাঁর ভাই পীতাম্বরকে পুঠিয়া রাজবংশের প্রথম রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করেন। পীতাম্বরের হাত ধরেই আনুমানিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে পুঠিয়া রাজবংশের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পীতাম্বর মারা যাওয়ার পর তাঁর ভাই নীলাম্বর মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন এবং পুঠিয়া জমিদারী একটি বিশাল সাম্রাজ্যে রূপ নিতে শুরু করে।”
পুঠিয়া রাজবাড়ীর ইতিহাসের সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো—এখানে রাজাদের চেয়েও রানীদের অবদান এবং প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। আঠারো এবং উনিশ শতকের দিকে যখন পুরুষ শাসকেরা একে একে অকালে মৃত্যুবরণ করছিলেন, তখন এই বিশাল জমিদারী পরিচালনা করার জন্য শক্ত হাতে হাল ধরেন রাজবংশের নারীরা।”
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন মহারানী শরৎকুমারী দেবী। আজ আমরা যে জাঁকজমকপূর্ণ ইন্দো-ইউরোপীয় ঘরানার মূল রাজপ্রাসাদটি দেখতে পাই, তা কিন্তু কোনো রাজা বানাননি, এটি বানিয়েছেন এই মহারানী শরৎকুমারী দেবী। ১৮৯৫ সালে তিনি তাঁর শাশুড়ি মহারানী ভুবনময়ী দেবীর স্মৃতি রক্ষার্থে এবং নিজের বসবাসের জন্য এই সুদৃশ্য প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। তখনকার সময়ে এটি তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল।”
এই প্রাসাদের স্থাপত্যশৈলী লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এর সামনের স্তম্ভগুলো ইউরোপীয় বা গ্রীক রেনেসাঁ স্টাইলের। অথচ ভেতরের কাঠামোটি সম্পূর্ণ দেশীয় এবং মোঘল রীতির মিশ্রণে তৈরি। রানীর সুনিপুণ ও কঠোর শাসনের কারণে পুঠিয়া রাজবাড়ী সে যুগে ব্রিটিশ সরকারের কাছেও অত্যন্ত সমীহ পেত এবং ব্রিটিশরা শরৎকুমারী দেবীকে ‘মহারানী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
পুঠিয়া রাজবাড়ী কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বড় অনন্যতা হলো এর মন্দিরগুলো। এখানে মোট ১৪টি ঐতিহাসিক মন্দির রয়েছে, যা ভারতের রাজস্থানের বাইরের অন্যতম বৃহত্তম মন্দির চত্বর। আর এই মন্দিরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় হলো এই পঞ্চরত্ন শিব মন্দির।”
১৮২৩ সালে মহারানী ভুবনময়ী দেবী এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এটি একটি উচু বেদীর ওপর নির্মিত। এই মন্দিরের চার কোণায় চারটি এবং মাঝখানে একটি বড় চূড়া রয়েছে, যার কারণে একে ‘পঞ্চরত্ন’ বলা হয়। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে একটি বিশাল কৃষ্ণপাথরের শিবলিঙ্গ, যা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিবলিঙ্গ।”

শেই রয়েছে ছোট ও বড় গোবিন্দ মন্দির। এই মন্দিরের দেয়ালগুলো যেন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাস! এখানকার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলকগুলোতে এত নিখুঁতভাবে রামায়ণ, মহাভারত এবং রাধা-কৃষ্ণের লীলা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, আপনি ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকলেও আপনার ক্লান্তি আসবে না। মাটির তৈরি এই ফলকগুলো প্রমাণ করে তখনকার শিল্পীরা কতটা দক্ষ ছিলেন
বন্ধুরা, এত সুন্দর একটি রাজপ্রাসাদ, অথচ এর পেছনে কি কোনো অন্ধকার রহস্য থাকবে না, তা কি হয়? স্থানীয় মানুষের মুখে এবং লোককথায় পুঠিয়া রাজবাড়ীকে নিয়ে বেশ কিছু রোমাঞ্চকর রহস্য প্রচলিত আছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো—গোপন সুড়ঙ্গ এবং দিঘির ভেতরের গুপ্তধন!
প্রাসাদের চারপাশে মোট ৬টি বিশাল দিঘি রয়েছে, যার মধ্যে শ্যামসাগর দিঘি সবচেয়ে বড়। কথিত আছে, রাজপরিবারের রানীরা যখন স্নান করতে যেতেন, তখন সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ ছিল। লোকমুখে শোনা যায়, মূল রাজপ্রাসাদ থেকে এই দিঘি এবং পুঠিয়া থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নাটোর রাজবাড়ী পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে একটি গোপন সুড়ঙ্গ বা সুড়ঙ্গ পথ ছিল! শত্রুদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে বা গোপনে যাতায়াতের জন্য রাজারা এটি ব্যবহার করতেন
যদিও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই সুড়ঙ্গের কোনো বাস্তব প্রমাণ পাননি, তবে প্রাসাদের ভেতরে কিছু বন্ধ কুঠুরি এবং মাটির নিচের ঘর (তহখানা) রয়েছে, যা আজ নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজপরিবারের শেষ বংশধরেরা যখন ভারতে চলে যান, তখন তারা নাকি তাদের বিপুল ধন-সম্পদ ও সোনা-দানা এই দিঘির নিচে বা প্রাসাদের দেয়ালে লুকিয়ে রেখে গেছেন। আজও অনেক কৌতূহলী মানুষ সেই গুপ্তধনের সন্ধান খোঁজেন!”
প্রতিটি সাম্রাজ্যেরই যেমন উত্থান থাকে, তেমনি তার পতনও অনিবার্য। ১৯শে শতাব্দীর শেষের দিকে এসে পুঠিয়া রাজবংশের গৌরব কমতে শুরু করে। ১৯৫০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ‘জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত’ করলে রাজাদের সমস্ত আইনি ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়। এরপর রাজপরিবারের সদস্যরা তাদের এই ৪৫০ বছরের পুরনো পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় চলে যান
রাজারা চলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন এই প্রাসাদটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ফলে অনেক মূল্যবান আসবাবপত্র, ঝাড়বাতি এবং মন্দিরের দামি কষ্টিপাথরের মূর্তি চুরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই পুরো রাজবাড়ী এবং মন্দির কমপ্লেক্সের দায়িত্ব নেয়। তারা সংস্কার কাজ করার পর আজ এটি একটি সংরক্ষিত জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।”
বন্ধুরা, পুঠিয়া রাজবাড়ী শুধু ইট-পাথরের কোনো দালান নয়। এটি আমাদের গৌরবময় অতীত, আমাদের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন এবং বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। শত ঝড়-ঝাপটা এবং অবহেলার পরও এই প্রাসাদটি আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়ের কথা।
মন্তব্য করুন