
বগুড়া জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে আদমদীঘি উপজেলার চাঁপাপুর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নেরই এক নিভৃত গ্রাম কাঞ্চনপুর। গ্রামের পিচঢালা পথ ধরে এগোতেই হুট করে আপনার চোখে পড়বে গাছপালা আর লতাপাতায় ঢাকা এক বিশাল কঙ্কালসার ভবন। এটাই সেই বিখ্যাত চৌধুরী বাড়ি। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এক রহস্য এবং দীর্ঘদিনের গৌরব।”
“ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়,কাঞ্চনপুর গ্রামে অবস্থিত এই চৌধুরী বাড়িটি প্রায় ১৫০ বছরেরও বেশি পুরনো । ব্রিটিশ আমলের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার এখানে তাদের রাজত্ব গড়ে তোলেন। তারা ছিলেন এই অঞ্চলের প্রভাবশালী তালুকদার বা জমিদার।এক সময় এই বাড়ির আঙিনায় হাতি, ঘোড়া আর পাইক-পেয়াদাদের আনাগোনা ছিল। রাজকীয় আভিজাত্য আর ক্ষমতার এক বড় কেন্দ্র ছিল এই প্রাসাদটি।” ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব আদায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং স্থানীয় শাসনের দায়িত্ব ছিল এই পরিবারের কাঁধে। প্রজাদের প্রতি তাদের প্রভাব এবং রাজকীয় জীবনযাপনের কারণে ব্রিটিশ সরকার তাদের ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করে। আর সেই থেকেই এই বাড়ি এবং পুরো এলাকাটি ‘চৌধুরী বাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়।”
“কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর এবং বংশধরদের স্থানান্তরের কারণে বাড়িটি ধীরে ধীরে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর প্রকৃতির নিয়মে আজ এটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত।ভবনের দেয়ালে এখন জন্মেছে শ্যওলা আর গাছপালা আগাছা । ছাদ ও দেয়াল ভেঙে পড়ছে প্রতিনিয়ত। চারপাশ ছেয়ে গেছে গভীর জঙ্গলে। দেখলে মনে হবে, এক সময়ের প্রতাপশালী জমিদার বাড়িটি আজ নিজেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য করুণ আকুতি জানাচ্ছে।”

ইতিহাস থেকে জানা যায় রাজা জগৎ কিশোর আচার্য ১৭৫০ সালে চৌধুরী বংশের তৃতীয় পুরুষ অযোধ্যা রামকে তার জমিদারি ও চৌধুরী উপাধি প্রদান করেন
অযোধ্যা রাম চৌধুরী উপাধি লাভ করে ১৭৫২ সালে তিনি এই চৌধুরী বাড়ি নির্মাণ করেন চৌধুরী বংশের কয়েক প্রজন্ম এই বাড়িতে বসবাস করেন
চৌধুরী বংশের ৩ এ পুরুষ অযোধ্যা রাম চৌধুরী চৌধুরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা ৪থ পুরুষ রামচন্দ্র চৌধুরী, ৫ম পুরুষ রামচরন চৌধুরী,৬ষ্ঠ পুরুষ সেমাচনণ চৌধুরী, ৭ম পুরুষ রোমন চৌধুরী, ৮ম পুরুষ খোকা চৌধুরী ,৯ম পুরুষ রাহুল চৌধুরী আনন্দ, সর্বশেষ দশম পুরুষ আদিত্য চৌধুরী
1973 সালে চাপাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চৌধুরী বংশের ৮ম পুরুষ খোকা চৌধুরী বিপুল ভোটে জয় লাভ করে ৫ নং ইউনিয়ন চাপাপুর এর চেয়ারম্যান হন, এরপর তিনি ১ বছর সততা ও নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেন,তার এই সততা আর জনপ্রিয়তাই চৌধুরী বংশের জন্য কাল হয়ে দাড়াই,এরপর চলতি সময়ে 1974 সালের ১৩ আগষ্ট একদল দুষকিতদের হামলায় দিনের বেলায় তিনি নির্মম ভাবে হত্যার স্বীকার হন,আর নেমে আসে চৌধুরী বাড়িতে শোকের ছায়া,
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, পুরো বাড়িটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে চুন-সুরকি এবং সেই আমলের বিশেষ পাতলা ইট । হৃদয় দিয়ে অনুভব করলে আপনি এখনো হয়তো শুনতে পাবেন সেই আমলের কোলাহল। বাড়ির এই বিশাল আঙিনাতেই বসতো জমিদারদের রাজদরবার। এখানেই হতো প্রজাদের বিচার-সালিশ। এলাকার শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক নানা উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই চৌধুরী বাড়ি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব উৎসবের আলো ছড়াতো এই বাড়ি থেকেই।”
“চাঁপাপুরের চৌধুরী বাড়িটি হয়তো একদিন পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে যাবে। কিন্তু এই অঞ্চলের মানুষের মনে এবং ইতিহাসে এর নাম থেকে যাবে চিরকাল। প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ যদি এই প্রাচীন নিদর্শনটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতো, তবে হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের গৌরবময় অতীতকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেখতো না

মন্তব্য করুন