হাঁসাইগাড়ী বিলের অবস্থান নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ী ও শিকারপুর ইউনিয়ন জুড়ে। নওগাঁ শহর থেকে মাত্র ১০ থেকে ১১ কিলোমিটার দক্ষিণে এই বিলের অবস্থান।
কিন্তু এর নাম ‘হাঁসাইগাড়ী’ কেন হলো? লোকমুখে প্রচলিত আছে, শত বছর আগে এই বিশাল জলাভূমিতে শীতকালে হাজার হাজার বুনো হাঁস এসে আশ্রয় নিতো। শিকারিরা এখানে হাঁস শিকার করতে আসতো এবং স্থানীয়রা বিপুল পরিমাণে হাঁস ধরতো। ‘হাঁস’ এবং তা শিকার বা ধরে রাখার ‘গাড়ী’ বা স্থান— এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই কালক্রমে এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় হাঁসাইগাড়ী।
একসময় এই বিলটি ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় একটি প্রাকৃতিক মাছের ভাণ্ডার। শুধু মাছই নয়, শীতকালে এই বিলের পানি যখন শুকিয়ে যেত, তখন এখানে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর পরিমাণে দেশি ধানের চাষ হতো। ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমলে এই বিলের জমিদারী ও জলমহাল নিয়ে নানা দ্বন্দ্বের ইতিহাস রয়েছে।
বর্ষাকালে এই বিলের রূপ যতটা যৌবনা, শীতকালে ঠিক ততটাই শান্ত। শীতের দিনে বিলের পানি নেমে গেলে দিগন্ত জুড়ে শুধু সবুজ আর সোনালী ধানের ক্ষেত চোখ জুড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ, এক বিলেরই দুই রূপ! এটি যেমন স্থানীয় হাজারো মৎস্যজীবীর জীবিকার উৎস, তেমনি হাজারো কৃষকের অন্নসংস্থানের মাধ্যম।
একসময় বর্ষাকালে এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা। বর্ষা এলেই হাঁসাইগাড়ী অঞ্চলের মানুষ এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে এই বিলের বুক চিরে তৈরি করা হয়েছে একটি চমৎকার আঁকাবাঁকা পাকা সড়কটি নির্মাণের পর থেকেই বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। রাস্তার দুপাশে যখন থইথই পানি এসে আছড়ে পড়ে, তখন মনে হয় যেন সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে কোনো পথ চলে গেছে। এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতেই প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এখানে ভিড় করেন। আর এভাবেই এটি পরিচিতি পায় নওগাঁর ‘মিনি কক্সবাজার’ বা ‘মিনি টাঙ্গুয়া’ হিসেবে।
আপনি যদি এখানে আসেন, তবে শুধু রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ানোই নয়, অল্প খরচে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ডিঙি নৌকা ভাড়া করে পুরো বিল ঘুরে দেখতে পারবেন। বিলের মাঝখানে ভাসমান কাঠের তৈরি সেতু আপনার ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
আর ভ্রমণ মানেই তো খাওয়া-দাওয়া! হাঁসাইগাড়ী বিলের পাড়ে এবং রাস্তার ধারে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট চায়ের দোকান ও খাবারের হোটেল। এখানকার মূল আকর্ষণ হলো বিলের একদম তাজা দেশি মাছের ফ্রাই বা কারি। টেংরা, পুঁটি, শিং বা বোয়াল মাছের গরম গরম ঝোল দিয়ে দুপুরের খাবারটা সারলে আপনার ভ্রমণ ষোলোকলা পূর্ণ হবে

হাঁসাইগাড়ী বিলের আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে আপনাকে আসতে হবে বর্ষাকালে, বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে।
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে আপনাকে আসতে হবে নওগাঁ জেলা শহরে। নওগাঁ শহরের ‘গোস্তহাটির মোড়’ বা ‘রুবির মোড়’ থেকে আপনি সহজেই সিএনজি, অটোরিকশা বা ইজিবাইক পেয়ে যাবেন। রিজার্ভ করলে ভাড়া পড়বে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা, আর লোকাল গাড়িতে জনপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যেই আপনি পৌঁছে যেতে পারবেন প্রকৃতির এই স্বর্গরাজ্যে।
যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে একটু মুক্তি পেতে এবং প্রকৃতির কাছাকাছি কিছু সময় কাটাতে নওগাঁর হাঁসাইগাড়ী বিল হতে পারে আপনার পরবর্তী ট্রাভেল ডেস্টিনেশন। তবে মনে রাখবেন, ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে এই সুন্দর পরিবেশকে নষ্ট করবেন না।
মন্তব্য করুন