
এটি এক জীবন্ত নারীর কবর,নিজের ইজ্জত আর সতীত্ব বাঁচাতে একটা জীবন্ত নারী বিলীন হয়ে গিয়েছিলো মাটির নিচে !এটি মানুষের তৈরি কোনো কবর নয়, স্বয়ং প্রকৃতির নিয়মে মাটি দুই ভাগ হয়ে তাকে লুকিয়ে নিল নিজের বুকে! উত্তরবঙ্গের প্রাচীন জেলা বগুড়া আর এই বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলায় গেলে আজও আপনি শুনতে পাবেন শত বছর আগের এই লোমহর্ষক অলৌকিক ঘটনা। লোকমুখে যা আজ পরিচিত ‘জীবন্ত মেয়ের কবর’ নামে। কিন্তু কে ছিলেন এই মেয়ে? কি ঘটেছিল সেই অভিশপ্ত রাতে?
ইতিহাস্যের সন্ধানে আমাদের পৌঁছাতে হবে বগুড়া জেলা সদর থেকে প্রায় কয়েক কিলোমিটার দূরে, কাহালু উপজেলার দেওগ্রাম বাজারের ঠিক পূর্ব পাশে ফকিরপাড়া গ্রামে। সরকারি তথ্য বাতায়নে এটি একটি অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত।
লোককথা এবং প্রাচীন জনশ্রুতি অনুযায়ী, আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগে এই এলাকায় বাস করতেন বিবি সাহেবানী শাহজাদী নামের এক মুসলিম তরুণী। তাঁর পিতা জহির উদ্দীন ছিলেন এলাকার একজন অত্যন্ত সৎ, সম্ভ্রান্ত এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। পিতার আদর্শেই বিবি সাহেবানী বড় হয়েছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন অপরূপ সুন্দরী, তেমনি তাঁর পর্দা, শালীনতা এবং আল্লাহর প্রতি ভক্তি ছিল পুরো অঞ্চলজুড়ে প্রশংসনীয়।
বিবি সাহেবানীর এই রূপ আর গুণের কথা একসময় ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের রাজ্যগুলোতে। তৎকালীন সময়ের অনেক প্রভাবশালী রাজা ও জমিদাররা তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু বিবি সাহেবানী সব অনৈতিক ও জোরপূর্বক প্রস্তাব সগৌরবে প্রত্যাখ্যান করেন। আর এই প্রত্যাখ্যানই ডেকে আনে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কালবৈশাখী ঝড়
জনশ্রুতিতে জানা যে, অপরূপা সুন্দরী বিবি সাহেবানী,ছিলেন একজন ধার্মিক ব্যক্তি। বিবি সাহেবানী তার পিতার ন্যায় সৎ চারিত্রিক গুনের অধিকারী ছিলেন। তার রূপ ও গুনে মুগ্ধ হয়ে এলাকার রাজা জমিদারগণ বিয়েরপ্রস্তাব পাঠালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করায় দেশের উত্তর এলাকার এক প্রতাপশালী লম্পট জমিদার তাকে অপহরণের চেষ্টা করেন। নিজের সম্ভ্রম ও সতীত্ব বাঁচাতে অসহায় মেয়েটি রাতের অন্ধকারে দেওগ্রামের জঙ্গলঘেরা পথ দিয়ে দৌড়াতে থাকেন। কিন্তু একপর্যায়ে লম্পটদের দল তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।
চরম বিপদের এই মুহূর্তে তিনি তার সম্ভ্রম রক্ষার্থে মহান প্রভূর নিকট আকুতি করেন হে প্রভূ আমি আর পৃথিবীতে থাকতে চাইনা মাটির নিচে যেতে চাই। প্রভূ তার প্রার্থনা সাথে সাথে মঞ্জুর করলে সেখানকার মাটি ফাঁকা হয়ে যায় এবং বিবি সাহেবানী দ্রুত গতিতে মাটির মধ্যে প্রবেশ করেন এবং মাটি আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। এ ঘটনার পর হতে বিবি সাহেবানী সেখানে চির নিন্দ্রায় শায়িত আছেন। বিবি সাহেবানীর এ কাহিনীর কোন দালিলিক প্রমান নেই, তবে ঘটনাটি শায়েস্তা খাঁর (হিজরী ৭৩৩, বাংলা ৭১৯ ইংরেজী ১৩১২ শাসন আমলে ঘটেছিল বলে এলাকাবাসীর অনুমান,
বন্ধুরা এক পবিত্র নারীর চোখের জল আর আর্তনাদ বৃথা যায়নি। মুহূর্তের মধ্যে এক বিকট শব্দে পায়ের নিচের মাটি দুই ভাগ হয়ে গেল। লম্পটদের দল কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিবি সাহেবানী জ্যান্ত অবস্থায় সেই মাটির ভেতরে প্রবেশ করলেন। এবং অলৌকিকভাবে মাটি আবার আগের মতো জোড়া লেগে গেল! অত্যাচারী বাহিনী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের সম্মান বাঁচাতে এক নারী জ্যান্ত বিলীন হয়ে গেলেন পৃথিবীর বুকে। পরবর্তীতে এই অলৌকিক স্থানটিতেই গড়ে ওঠে আজকের ‘সতীকন্যা বিবি সাহেবানীর মাজার’।
এই অলৌকিক ঘটনার কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত বা দালিলিক প্রমাণ আধুনিক ইতিহাসে মেলেনি। তবে স্থানীয় প্রবীণদের অনুমান এবং বংশানুক্রমিক লোককথা অনুযায়ী, ঘটনাটি সম্ভবত সুদূর শায়েস্তা খাঁর শাসন আমলে ঘটেছিল।
শত শত বছর পার হয়ে গেলেও স্থানীয় মানুষের মনে এই স্থানটিকে নিয়ে রয়েছে গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। অনেক ভক্ত ও দর্শনার্থী বিশ্বাস করেন, এই পবিত্র স্থানে এসে মানত করলে মনের নেক আশা পূরণ হয়। আধুনিক বিজ্ঞান হয়তো একে কেবলই লোককথা বলবে, কিন্তু মানুষের বিশ্বাসের কাছে বিবি সাহেবানী আজও এক অনুপ্রেরণার নাম, যিনি জীবন দিয়েছেন কিন্তু সতীত্ব বিসর্জন দেননি
বগুড়ার কাহালুর এই সতীকন্যা বিবি সাহেবানীর মাজার কেবল একটি সাধারণ সমাধি নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের শত বছরের বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন।আপনার কি এই অলৌকিক ঘটনাটি জানা ছিল? অথবা আপনার এলাকায় কি এমন কোনো রোমাঞ্চকর লোককাহিনী প্রচলিত থাকলে আমাদের কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন
মন্তব্য করুন