বুদ্ধ দর্শনের একটি বিশেষ জায়গাজুড়ে অবস্থান করছে একটি দার্শনিক-তত্ত্ব- সেটি হলো “প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি। তত্ত্ব”। যাকে ইংরেজিতে বলা -হয় Dependent origination,
যুদ্ধের প্রদত্ত চারি আর্য সত্য দর্শন এবং অপারাপর দার্শনিক মতবাদ মূলত এই প্রতীত্য সমুৎপাদ নামক দার্শনিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত – এই মতবাদের মাধ্যমে মহামানব বুদ্ধ পৃথিবীর এই জীবন ও জগত এর স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়াও বুদ্ধ দর্শনের সকল প্রকার জটিল বিষয়াবলীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় উক্ত মতবাদ বা তত্ত্বের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সবচেয়ে জটিল বিষয় দুঃখ এর উৎপত্তি ও নিরোধ সম্পর্কিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব সমগ্র বৌদ্ধ দর্শনের আধার বা আশ্রয় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।
প্রতীত্য সমুৎপাদঃ-
বাংলায় “প্রতীত্য সমুৎপাদ” শব্দটি পালি অভিধানে আছে-“পটিচ্চ- সমুপ্পাদ” রূপে।
“পটিচ্চ” শব্দের বাংলা অর্থ- কার্যকারণ বশত এবং “সমুপ্পাদ” এর অর্থ হলো- উৎপত্তি। অর্থাৎ, আক্ষরিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, পটিচ্চ সমুপ্পাদ (প্রতীত্য সমুৎপাদ) এর অর্থ দাঁড়ায়- কার্যকারণবশত উৎপত্তি। একে দ্বাদশ প্রকার কারণ সমন্ধীয় মতবাদ বা কার্যকারণ নীতি ও বলা হয়ে থাকে।
কার্য ও কারনের দ্বারা অবিচ্ছিন্নভাবে চক্রের মতো দ্বাদশ-অঙ্গে বারবার ঘুরছে বলে একে ভব চক্র বা সংসারচক্র বলা হয়।
মহা মানব গৌতম বুদ্ধ গয়ার উরুবেলায় নিরঞ্জনা, নদীর তীরস্থিত বৌধিবৃক্ষমূলে বৈশাখী পূর্ণিমার জ্যোৎস্না রাতের শেষ প্রহরে সর্বজ্ঞতা লাভ করেন। এই সর্বজ্ঞতা লাভের পর এক সপ্তাহ ধ্যান করে তিনি প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্বের অনুলোম ও পটিলাম ভাবনার সংস্কারিত রূপ তুলে ধরেন।
অনুলোম:
ইতি ইমস্মিং সতি ইদংহোতি,
ইমস্সুপ্পাদা ইদং উপ্পজ্জতি”
-অর্থাৎ, যদি এই কারনটি থাকে তবে এই ফলটি হয়, এইটির সৃষ্টি হলে ঐটিরও সৃষ্টি হয়। বিষয়টি পর্যায়ক্রমে নিম্নে দেখানো হলো-
অবিদ্যার কারনে সংস্কারের সৃষ্টি হয়, সংস্কারের কারনে বিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়, বিজ্ঞানের কারণে নামরূপের সৃষ্টি হয়, নামরূপের কারণে ষড়ায়তনের সৃষ্টি হয়, ষড়ায়তনের কারণে সস্পর্শের সৃষ্টি হয়, স্পর্শের কারণে বেদনার সৃষ্টি হয়, বেদনার কারণে তৃষ্ণার সৃষ্টি হয়, তৃষ্ণার কারণে উপাদানের সৃষ্টি হয়, উপাদানের কারণে ভবের সৃষ্টি হয়, ভবের কারণে জাতির সৃষ্টি হয়, জাতির কারণে জরা, মৃত্যু, শোক, হতাশার সৃষ্টি হয়।
পটিলোম (প্রতিলোম):
“ইতি ইমস্মিং অসতি ইদং ন হোতি
ইমসস নিরোধা ইদং নিরুঋতি”
-অর্থাৎ, যদি এই কারণ না থাকে-তাহা হলে, এই ফল হয় না। ইহার নিরোধে তহার নিরোধ হয়। নিম্নে বিপরীত ক্রম দেখানো হলো-
অবিদ্যার নিরোধে সংস্কারের নিরোধ, সংস্কারের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধে, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ, ভবের নিরোধে জন্মের নিরোধ জন্মের নিরোধে জরা, মৃত্যু, বিলাপ, হতাশার নিরোধ।
অবিদ্যা (Ignorance):-
অবিদ্যা শব্দের পালিরূপ ” অবিজ্জা, যার শাব্দিক অর্থ হলো অজ্ঞানতা, বিদ্যা বা জ্ঞানের অভাব। মূলত, কোনো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সঠিকভাবে না জানাই হলো অবিদ্যা। এই অবিদ্যা আমাদের চিত্তে লোভ, দ্বেষ, মোহের আকারে উৎপন্ন হয়ে থাকে। অবিদ্যা তৃষ্ণা, জন্ম ও দুঃখের মূল কারন। মহা-মানব গৌতম বুদ্ধ এই অবিদ্যা হতে মুক্তি লাভের জন্য পথ দেখিয়েছেন, যা হলো আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ।
সংস্কার (Activities):-
সংস্কার এর পালি রূপ হলো- সঙখার। এর অর্থ হলো প্রার্থনা, মনঃস্কামনা, মনোপ্রবৃত্তি, ইচ্ছা ইত্যাদি। মূলত সংস্কার বলতে চেতনা কে বোঝানো হয়ে থাকে।
“অঙ্গুত্তর নিকায়” নামকগ্রন্থে বুদ্ধ বলেছেন-
-চেতনাহং ভিক্খবে কম্মং বদামি”
অর্থাৎ, হে ভিক্ষুগন! চেতনাকে আমি কর্ম বলি। বস্তুত চেতনাই কর্মে রূপায়িত হয়। অবিদ্যার আবর্তে কোন ব্যক্তি, যদি কায়,মনো, বাক্যে কোনো কর্ম সম্পাদন করে তবে সেই কর্ম সংস্কার এ রূপায়িত হয়। সংস্কার তিন প্রকার-* পুণ্য সংস্কার * অপুন্য সংস্কার * মিল্প সংস্কার।
এই সংস্কার মানবকে মায়ামোহে আবদ্ধ করে থাকে। অবিদ্যার ফলে এর সৃষ্টি, অবিদ্যার নিরোধে সংস্কার নিরোধ হয়ে থাকে।
বিজ্ঞান (consiousness):-
বিজ্ঞান শব্দের পালি রূপ হলো “বিঞঞান”। এর অর্থ হলো মন, চিও, বিশেষ জ্ঞান, ভাবনার বা চিন্তা করার বিষয় ইত্যাদি। “সংযুক্ত নিকায় ” -গ্রন্থের অনুবাদ করতে নিয়ে রীস ডেভিস বলেন “বিজ্ঞান হলো আত্মজ্ঞান, চেতনা, প্রত্যক্ষজ্ঞান।” মূলত, ব্যক্তিগত জীবনকে মৃত্যুর পর দেহত্যাগ ও পরলোকে রূপান্তর প্রদানকারীকে বলা হয় বিজ্ঞান। সংস্কারের উদয়ে বিজ্ঞানের উদয় হয় এবং সংস্কার নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ সম্ভবপর হয়ে উঠে।
নামরূপ (Mind and matter):
নাম শব্দের অর্থ- মন আর রূপ অর্থ শরীর। এখানে নাম বলতে ব্যক্তির সূক্ষ্ম বা মানসিক অংশকে বোঝায়, অপরদিকে রূপ বলতে দেহ বা কায়িক অংশকে বোঝানো হয়ে থাকে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে নাম হচ্ছে মানসিক দেহ আর রূপ হলো শারীরিক দেহ। রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান এই সবগুলো মিলে পঞ্চস্কন্ধ নামে পরিচিত। এই পঞ্চস্কন্ধ দুই ভাগে বিভক্ত দেহ ও মন। বিজ্ঞানের উদয়ে নাম-রূপের উদয়, বিজ্ঞানের নিরোধেই নামরূপের নিরোধ।
ষড়ায়তন (six sense):-
ষড়ায়তনের পালি রূপ হলো “সলায়তন”, অর্থ হলো ষড়বিধ ইন্দ্রীয়। যথা- চক্ষু, নাসিক্য, কর্ন, জিহ্বা, ত্বক, মন ইত্যাদি। এদের মধ্য চক্ষু ইন্দ্রিয় দর্শন, কর্ন ইন্দ্রিয় শ্রবণ, নাসিকা ইন্দ্রিয় গন্ধগ্রহণ, জিহ্বা ইন্দ্রির স্বাগ গ্রহণ, ত্বক ইন্দ্রিয় স্পর্শ গ্রহণ, মন ইন্দ্রিয় দ্বারা ভাব গ্রহণ করা হয়। দেহ ও মনের সম্মিলিত রূপ হলো ষড়ায়তন। নামরূপ এর কারনে ষড়ায়তনের সৃষ্টি এবং নিরোধে নিরোধ।
স্পর্শ (Contact):
স্পর্শ এর পালি রূপ হলো ফস্স অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য গুনবিশেষ। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাথে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাহিরের পঞ্চ রূপবস্তুর যথারূপে মিলন বা সংস্পর্শ সংঘটনকে বলা হয় স্পর্শ। ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শের উৎপত্তি হয়ে থাকে। স্পর্শ ব্যতিরেকে বস্তুর সম্বন্ধে সঠিক ধারনা করা ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কার্য কারণ প্রবাহে বলা হয়েছে ষড়ায়তন হলো স্পর্শের কারণ। ষড়ায়তন নিরোধে স্পর্শের নিরোধ।
বেদনা (Sensation):
বেদনা শব্দের অর্থ হলো অনুভব, অনুভূতি, উপলদ্ধি ইত্যাদি। স্পর্শের ফলে বক্তির পছন্দ বা অপছন্দ অনুসারে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয় তাই হলো বেদনা। বেদনা তিন প্রকারের হয়-
ক. সুখ বেদনাঃ আনন্দজনক অনুভূতি,
খ. দুঃখ বেদনা: যন্ত্রনাপূর্ণ অনুভূতি,
গ. না সুখ না দুঃখ বেদনাঃ আনন্দ ও যন্ত্রণা কোনোরূপ অনুভূতি নয়।
স্পর্শের করেনে বেদনার উৎপত্তি। স্পর্শের নিরোধে এর নিরোধ হয়।
তৃষ্ণা (Craving):
তৃষ্ণা শব্দের পালি রাপ তণহা। অর্থ হলো কামনা, বাসনা, আসক্তি, তীব্র আকাঙ্খা ইত্যাদি। ষড়েন্দ্রিয় ও গ্রাহ্য বিষয়ের প্রতি মানুষের যে আসক্তি বা অনুরাগ তাই হলো তৃষ্ণা। তৃষ্ণাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. কাম তৃষ্ণা- অন্তহীন কামনাই কাম তৃষ্ণা।
খ. ভব তৃষ্ণা – পুনঃপুন বার তন্ম নেওয়াকে ভব তৃষ্ণা বলা হয়।
গ. বিভব তৃষ্ণা- উচ্ছেদবাদীদের তৃষ্ণাকে বিভবতৃষ্ণা বলা হয়। যেখানে জন্মান্তর নেই।
উপাদান (Attachment):-
উপাদান শব্দের অর্থ হলো সংযুক্তি, সংযোগ, আসক্তি, দৃঢ় গ্রহণ,ধারন ইত্যাদি। কাম্যবস্তুকে সংরক্ষন ও দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করাকেই উপাদান বলা হয়ে থাকে। উপাদান চার প্রকার
ক. কাম উপাদান
খ. দৃষ্টি উপাদান
গ.শীলব্রত উপাদান
ঘ.আত্মবাদ উপাদান
ভব (Action):-
ভব শব্দের অর্থ হলো উৎপত্তি হওয়া, পূর্নবার জন্ম নেওয়া, জয়,সংসার ইত্যাদি। উপাদান বা দৃঢ় আসক্তির ফলেই ভবের উৎপত্তি হয়। ভব দুই প্রকার। যথাঃ-
ক. কর্ম ভব
খ. উৎপত্তি ভব
কর্ম ভবকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পুন্যভব, অপূণ্যভব ও আনেজ্ঞাভিসঙখারা ভব।
মূলত, উপাদানের কারণে ভবের উদয় হয় এবং উপাদানের নিরোধে কারণে ভবের উদয় হয়।
জাতি (Birth):-
জাতি এর বাংলা অর্থ জন্ম। জীব এর উৎপত্তিকেই জন্ম বা জাতি বলা হয়। কর্মভবের প্রভাবে মানুষ – চার অপায়ে, এক মনুষ্যলোকে, ছয় স্বর্গে, ১৬ প্রকার ব্রহ্মলোকে এবং চার অরাপ অর্থাৎ, ৩১ প্রকার লোকভূমির মধ্যে আবর্তন করছে। ভবের উদয়ে জাতির উদয়। ভবের নিরোধে জাতির নিরোধ হয়।
জরা-মরণ (Decay):
যে সত্ত্বগনের যে যে সত্ত্ব নিকায়ে যে জীর্নতা, খন্তদন্ততা, পরিতকেশ, শশ্মশ্রুতা, লোল চর্মতা ও আয়ুক্ষয় এবং ইন্দ্রিয়গুলোর পরিপঙ্কতা হয় তাকে জরা বলে।
যে যে সত্ব নিকায় থেকে যে চ্যুতি অন্তধা পঞ্চস্কন্ধ সমূহের ভাঙ্গন, কলেবর দেহ ত্যাগ করে তাকে মৃত্যু বা মরণ বলে।
এই জরা এবং মৃত্যুকে একবে বলে জরা-মরণ।
জন্মের ফলে জরামরণের সৃষ্টি হয় এবং -জনন নিরোধে জরা- মরণ নিরোধিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, প্রতীত্য সমুৎপাদ বা কার্যকারন তত্ত্বে দুঃখের উৎপত্তি ও নিরোধ কথিত রয়েছে। এই তত্ত্বের দ্বারা আনুক্রমিক অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত জন্মের পরস্পর সম্বন্ধ দেখানো হয়েছে। অতীত জন্মের কারনস্বরূপ মানুষের পরবর্তী-জন্মান্তর হয়। যদি অবিদ্যা ও সংস্কারাদি চেতনা না থাকত তাহলে মানুষের পরবর্তী জন্ম ঘটত না।
মানুষ যখন গভীর প্রজ্ঞা, পূর্ণজ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা সকল বিষয় সমূহ বুঝতে সমর্থ হয় ঠিক তখনই তার আর কোনো তৃষ্ণা, অবিদ্যা, সংস্কার থাকে না। দুঃখ মুক্তির পথ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণে পরম শান্তি, পরম সুখ ও নির্বান লাভ করা যায়। যা প্রতীত্য-সমুৎপাদের একটি অন্যতম উদ্দেশ্য।
মন্তব্য করুন