খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধের আর্বিভাবের সাথে সাথে ভারতের ইতিহাসে ধর্ম ও দর্শনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় যুদ্ধ। প্রবর্তিত ধর্ম প্রাচীন ভারতে যেরূপ দীর্ঘকাল ধরে ব্যাপক ও গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল তার নিদর্শন অন্য যেকোনো দেশের ইতিহাসে বিরল। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক Basham – “বুদ্ধ ভারতের শ্রেষ্ঠ সন্তান” বলে মন্তব্য করেন। কিন্তু বুদ্ধ আসার পূর্বে এই ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল এক অন্ধকার জগতের প্রতিচ্ছবি, সেই সময়কার ইতিহাস জানতে হলে জানতে হবে “প্রাক বুদ্ধ যুগ”
প্রাক বুদ্ধ যুগ ও গৌতম: পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশকে জম্বুদ্বীপ বলা হতো। মূলত ষোড়শ মহাজনপদের সমন্বয় ছিল এই উপমহাদেশে। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে যতজন মহামনীষী জন্মগ্রহণ করেছিলেন তন্মধ্যে গৌতম বুদ্ধ অন্যতম।
প্রাক বুদ্ধ যুগ বলতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম পূর্ববর্তী থেকে, বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভ অবধি সময়কালকে বোঝায়। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধ এক বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে জম্বুদ্বীপের কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শাক্য বংশীয় রাজা শুদ্ধোধন এবং মাতা মায়াদেবী। তিনি ২৯ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন, এবং দীর্ঘ ৬ বছর কঠোর সাধনা করে ৩৫ বছর বয়সে বুদ্ধত্ব লাভ করে। তিনি বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বের যে সময় সেটি প্রাক বুদ্ধ যুগ। যার ইতিহাস অতন্ত অন্ধকারাচ্ছন।
বৌদ্ধধর্মের পূর্ববর্তী সময়ের ভারতবর্ষঃ বৌদ্ধধর্মের উত্থান পূর্ববর্তী সময়ে ভারতবর্ষ ছিল এই অরাজকতার মধ্যে। তখনকার মানুষের মধ্যে কোনো নিয়মনীতি, শৃঙ্খলাবোধ বলতে কিছুই ছিলো না। অসহিষ্ণুতা যা অসংযমশীলতা ছিলো মানুষের প্রধান শত্রু যা তৎকালীন ভারতবর্ষের লোকজনের মধ্যে প্রবল পরিমান ছিল। তখন মানুষ লোভ-দ্বেষ মোহের বশবর্তী ছিলো। প্রত্যেকে নিজ নিজ সম্পত্তি ও ক্ষমতা বৃদ্ধিতে তৎপর ছিলো। এ কারনে মানুষের মধ্যে সর্বদা সংঘাত ও দ্বন্দ্ব লেগেই থাকতো। এভাবে ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে জাতিতে- জাতিতে বিভেদ সৃষ্টি হতো। রাজ্যে রাজ্যে কোন ঐক্য ছিল না। ফলে বুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের প্রাচীন ভারতের ইতিহাস হয়েছিল দুর্বল ও অনুন্নত। তৎকালীন ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সকল অবস্থা ছিল সবুই শোচনীয়। নিম্নে তৎকালীন সময়ের ভারতবর্ষের অবস্থা বিভিন্ন দিক থেকে তুলে ধরা হলো, দিকগুলো হলো-রাজনৈতিক অবস্থা, সামাজিক অবস্থা,অর্থনৈতিক অবস্থা, ধর্মীয় অবস্থা।
রাজনেতিক অবস্থাঃ- পালি সাহিত্যের কয়েকটি গ্রন্থে যথাঃ অঙ্গুত্তর নিকায়, দীর্ঘ নিকার ও জৈন ভগবতী সূত্রে উল্লেখিত আছে যে, গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবকালে ভারতবর্ষে কোন রূপ রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। তখনকার সময় ভারতীয় উপমহাদেশ ষোলটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বা মহাজনপদে বিভক্ত ছিল। ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে মগধ,কোশল, বৎস, অবন্তী প্রভৃতি পরাক্রমশালী রাজের নৃপতিগণ প্রায়ই পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত থাকতেন। মহাজনপদগুলোর অধিকাংশই অবস্থিত ছিল বিহার,উত্তর প্রদেশ এবং মধ্যভারতে। তখনকার রাজ্য ব্যবস্থা ছিল রাজা নির্ভর। রাজার একার পক্ষে বিশাল রাজ্য পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। তাই তিনি “মহামাত্র” নামের নতুন পদের প্রচলন করেন এবং মহামাত্র ও অমাত্যদের মাধ্যমে রাজ্য পরিচালনা করতেন। তাদের মাঠ উল্লেখযোগ্য ছিলেন- সেনানায়ক, রঞ্জ গ্রাহক অমাত্য সৈন্য বাহিনী, আমলাতন্ত্র ছিল রাজার প্রধান শক্তি। ততৎকালীন চারটি বাহিনীর কথা উল্লেখ পাওয়া যায় যথাঃ-হস্তী বাহিনী,অশ্ব বাহিনী,রথ বাহিনী,পদাতিক বাহিনী।
সামাজিক অবস্থাঃ বৌদ্ধধর্মের উত্থানের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের আামাজিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল না। সমাজে অনেক কুসংস্কার ও প্রথার প্রচলন ছিল। সমাজ বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজমান ছিল।
কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসঃ তখনকার সময়ে সমাজে নানারকম কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল। যেমন: সতীদাহ প্রথা, দাস প্রথা, বর্ণ বৈষম্য, বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ ইত্যাদি। এছাড়াও সমাজের মানুষ নানা রকম অন্ধ বিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিল। পশু বলি, নরবলি দেওয়া হতো,কন্যাশিশু জন্মদানকে অভিশাপ বলে ধরে নেওয়া হতো।
বৃত্তি বা পেশা অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগঃ তৎকালীন সময়ে ভারতীয় আর্য সমাজে বৃত্তি বা পেশা অনুযায়ী পৃথক পৃথক শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল ।যথাঃ শাসকশ্রেণি- রাজা, জমিদার, যাজক শ্রেণি-পুরোহিত, পণ্ডিত,সাধারন শ্রেণি,মধ্যবিত্ত শ্রেনি,অনার্য বা কৃষষ্ণবর্ণ- উপরের তিনশ্রেণির অধীনস্থ।
দাস প্রথাঃ বুদ্ধ আবির্ভাবের পূর্বে সাধন ভারতে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। আর এই দাস প্রথার স্বীকার হতো নিম্নশ্রেনির মানুষ। তাদের অর্থের বিনিময়ে ভাড়া করে বা ক্রয় করে ক্রীতদাস করে রাখা হতো।
জাতিভেদ প্রথাঃ বর্ণভেদ যেমন ছিল ঠিক তেমনি ছিল জাতিভেদ। তৎকালীন সময়ে চারটি পৃথক জাতি গোষ্ঠীর প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। যথাঃ-
ব্রাহ্মণ: এই শ্রেনি সমাজের উঁচু অবস্থানে ছিল। তারা সমাজ পরিচালনা করতেন। তারা ছিল যাজক বা পুরোহিত ও শিক্ষিত।
ক্ষত্রিয়ঃ এই শ্রেনি বেশিরভাগ সময়ই যুদ্ধ করতেন। এছাড়াও রাজ্য পরিচালনা করা দদের অন্যতম কাজ।
বৈশ্য: এই শ্রেনির লোকেরা করসা-বানিজ্য করতো, এছাড়াও পশুপালন ও কৃষি কাজ করতেন।
শুদ্রঃ এই শ্রেনির লোকেরা উচ্চ বর্ণের মানুষের দাস হয়ে কেবল মম অত্যাচার ও লাঞ্ছনার শিকার হতো। সামাজিক মর্যাদায় মরা ছিল সমাজের সবচেয়ে নিম্ন স্তরের মানুষ।
শিক্ষাব্যবস্থাঃ তৎকালীন সমাজে শিক্ষাব্যবস্থা ছিল গুরুনির্ভর। গুরু দক্ষিণা দিয়ে শিক্ষা গ্রহণা করতে হতো। সেই সময় একমাত্র শিক্ষিত শ্রেনি ছিল ব্রাহ্মণগন। সেই সময় শিক্ষার বিষয় ছিল- ত্রিবেদ, ধনুবিদ্যা আয়ুর্বেদ, শিল্প শিক্ষা, সংখ্যা, গনিত, সঙ্গীত, পুরান, ইতিহাস, জ্যোতিষ, যুদ্ধবিদ্যা-মুদ্রাজ্ঞান ইত্যাদি। রাজকুমারগন শিক্ষা গ্রহণ করতেন রাজ-পুরোহিতগণের মাঠমে।
তৎকালীন সমাজে নারীঃ
তৎকালীন সমাজে নারীরা ছিল সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। কন্যা সন্তান জন্মদানকে অভিশাপ বলে বিবেচনা করা হতো। সামাজিক কোনো মর্যাদা ছিল না নারীদের। নারীরা ব্যবহার করা হতো একমাত্র বিনোদনের ও ভোগ্য পন্য হিসেবে। তাদের শিক্ষার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মীয় বেড়াজালে তার ঘরে বাইরে বের হতে পারতেন না। নারীদের এত বেশি অবমূল্যায়ন ছিল যে স্বামীর মৃত দেহের সাথে তাদেরকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, বিধবা নারীদের বিবাহের কোনো নিয়ম ছিল না। এমন কী নারীদের কেনাবেচার ও প্রথা ইতিহাস পাওয়া যায়।
অর্থনৈতিক অবস্থাঃ- তৎকালীন সমাজে অর্থনীতি ছিল কৃষি নির্ভর। গম-যব, ভুট্টা ইত্যাদি ছিল প্রধান অর্থকরী ফসল। সনাতন পদ্ধতিতে অর্থাৎ লাঙ্গলের ফলা ও পশু ব্যবহার করে এবং সেচ দিয়ে কৃষি কাজ করা হতো।
জীবন ও জীবিকা: সমাজের উচ্চ শ্রেনির লোকদের আর্থিক অবস্থা উন্নত ছিল। তারা সমুদ্র পথে দেশ- বিদেশে পণ্য আমদানি রপ্তানি করতেন। একশ্রেনির মানুষ কৃষিকাজের আথে জড়িত ছিলেন, তারা খাদ্য- শস্য উৎপাদন করতেন। শুদ্ররা কেবল দাসত্ব করে জীবন কাটাতো, তাদের কোন সম্মান ও সম্পদ ছিল না।
কর ব্যবস্থাপনা:- তখনকার সময় রাজা বা জমিদারগন রাজ্য শাসন বা পরিচালনা করতেন এবং প্রজাদের নিরাপত্তা দিতেন। এই নিরাপতার নামে জনসাধারণের উপর আরোপ করা হতো বিশাল করের ভার। ফসল ফললেও তা পরিশোধ করতে হতো না ফললেও করতে হতো, এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল চরম পর্যায়ের। সাধারন মানুষ করের জন্য অনেক বেশি অত্যাচারিত ও নীপিড়িত হতো।
ধর্মীয় অবস্থা:-গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবকালে ভারতে ব্রাহ্মণদের আধিপত্যে ধর্মীয় কঠোরতা তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারন করেছিল। তৎকালীন সমাজে, জৈন ধর্মের প্রচলন ছিল বলে ধারনা পাওয়া যায়।
চার আশ্রম প্রথা- যুদ্ধের আবির্ভাবকালে বৈদিক যাগযজ্ঞের ব্যয়বহুল আড়ম্বর, সমাজ জীবনের চারটি আশ্রম প্রথা ছিল। যথাঃ ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বাণপ্রস্থ, সন্ন্যাস। দার্শনিক পুরুগম্ভীর তত্ত্ব সাধারন মানুষের পক্ষ্যে গ্রহনীয় না হয়ে অত্যাচারে পর্যবসিত হয়েছিল।
ব্রহ্মচর্য: ব্রাহ্মণরা যে চর্যা পালন করে তাই ব্রহ্মাচর্য, ১-২৫ বছর পর্যন্ত এহ্মচর্য পালন করা হয়। গার্হস্থঃ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে গৃহীজীবন পরিপলনাই গার্হস্থ। ২৬-৫০ বছর বরসে এ জীবন পালন করা হয়। বানপ্রস্থ:নির্দিষ্ট সময়ে গৃহত্যাগ করে বনে বাসস্থান নির্মান করে ধর্ম পালনকে বানপ্রস্তবলে। ৫১-৭৫ বছর বয়সে এটি পালন করা হয়।সন্ন্যাস: গৃহত্যাগ করে বনে ধ্যান সাধনায় নিমিত্ত হওয়াই সন্ন্যাস জীবন। ৭৬-১০০ বা মৃত্যুকালীন সময় সন্ন্যাস সন্ন্যাস জীবনের সময়কাল।
ষড়তীর্থঙ্কর:- ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ব্যতীত বুদ্ধের সমসাময়িক যুগের অবৈদিক ছয়জন ধর্মোপদেষ্টার উল্লেখ পাওয়া যায় যা জন সমাজে বিশেষ খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করেছিল। এ ছয়জন ধর্মগুরুকে ষড়তীর্থঙ্কর বলা হয়ে থাকে। ছয়জন হলেন- পূরণ কাশ্যাপ, মোকখলি গোসাল, অজিত কেশ কম্বলি, পুকুধ কচায়ন, সঞ্চয় বেলটুটিপুত্র, নিগণ্ঠ নাথপুত্র। তাদের মতবাদ ৬২ প্রকার মিথ্যা দৃষ্টিতে আচ্ছন্ন ও তখনকার সমাজে অনেক বেশি প্রচলিত ছিল। এসব দৃষ্টি দ্বারা সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায় না। ৬০ প্রকার মিথ্যা দৃষ্টিকে ব্রহ্মজাল সূত্রে ৮টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- শাশ্বতবাদ, একাংশ শাশ্বতবাদ, অন্তানন্তিকবাদ, অমরাবিক্ষেপিকাবাদ, অধিচ্ছসমুপ্পনিকাবাদ,উর্দ্ধমাঘত, নিকাবাদ, উচ্ছেদবাদ, দৃষ্টিধর্ম নির্বাণ বাদ।
পরিশেষে বলা যায়, বুদ্ধের সমসাময়িক যুগের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক বিষয়গুলো আলোচনা করলে একটি বিষয় সুসস্পষ্ট হয়ে উঠে তৎকালীন যুগ ছিল অনেক বেশি বিশৃঙ্খল, অরাজক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন।
|
১৬ মে, ২০২৬